আজ ভয়াল ২৫ মার্চ: গণহত্যা দিবস

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ: গণহত্যা দিবস
March 24 15:45 2017

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বর্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাদের পূর্ব পরিকল্পিত অপারেশন সার্চলাইটের নীলনকশা অনুযায়ী ঢাকাসহ সারাদেশে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরোচিত ও নিকৃষ্টতম গণহত্যা চালায়।

২৫ মার্চ গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া পরিকল্পিত ভাবে নিরস্ত্র মানুষ হত্যার এমন দৃষ্টান্ত আর দ্বিতীয়টি নেই। একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর এ গণহত্যার দিনটি জাতীয় ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এ দিনটিকে এবারই প্রথম জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। মধ্যরাত থেকেই নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে দিবসটি পালন করছে বাঙালি জাতি।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত দেশ ও জাতির ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।’ তিনি বলেন, ‘গণহত্যা দিবস’ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ৩০ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগের মহান স্বীকৃতির পাশাপাশি তৎকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধেও চরম প্রতিবাদের প্রতীক।’

আবদুল হামিদ বলেন, ‘নানা ষড়যন্ত্র করেও বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে প্রতিহত করতে না পেরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করতেই ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদাররা এ দেশের গণমানুষের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। তাদের জঘন্য এ হত্যাযজ্ঞে হাত মিলিয়েছিল তাদের দোসর কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনী।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাঙালি জাতিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তৎকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তা বিশ্বের সকল গণমাধ্যমেই গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছিল। হত্যা-নিপীড়নের ভয়াবহতায় এক কোটি বাঙালি আশ্রয় নিয়েছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে ভারতের অনেক সেনা মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আমরা তাঁদের পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।’

দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে তাঁর সরকার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মাহুতির প্রতি জাতির চিরন্তন শ্রদ্ধার স্মারক এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে। অর্থনৈতিক শোষণ ছাড়াও তারা ‘আমাদের’ ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়।’

বাণীতে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘পাকিস্তানিদের এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম রুখে দাঁড়ান। তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সংগ্রাম। বাঙালিদের ওপর নেমে আসে অত্যাচার ও নির্যাতন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ৬ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের পথ ধরে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম যৌক্তিক পরিণতির দিকে ধাবিত হয়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শহর ও বন্দরে হত্যা করা হয় হাজার হাজার নিরীহ মানুষ। সেই রাত থেকে পরবর্তী নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর-রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর সদস্যরা সারা দেশে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালায়। হত্যা করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষকে। এত কম সময় ও স্বল্প পরিসরে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যার নজির বিশ্বে আর নেই। শুধু মানুষ হত্যা নয়, একই সঙ্গে দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করা হয়। লাখ-লাখ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট করা হয়। বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত করা হয় প্রায় এক কোটি মানুষকে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বমুহূর্তে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তৎকালীন ইপিআর ওয়ারলেসসহ টেলিপ্রিন্টার-টেলিগ্রামের মাধ্যমে এ ঘোষণা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী এবং তার দোসরদের সেই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ শুরুর দিন ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২০ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ প্রতিবছরের ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে। এর আগে গত ১১ মার্চ মহান জাতীয় সংসদে এ দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।’

কর্মসূচি ও আয়োজন

নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ভিন্ন মাত্রায় এবার পালিত হবে ২৫ মার্চ-জাতীয় গণহত্যা দিবস। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এ উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুদিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনীসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ২৫ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভসংলগ্ন স্থানে ‘রক্তাক্ত ২৫ মার্চ : গণহত্যার ইতিবৃত্ত’ শীর্ষক এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ গণবিচার আন্দোলন ও শ্রমিক-কর্মচারী পেশাজীবী মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদ যৌথভাবে এ দিন বিকেল ৩টায় ঢাকার শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং মোমবাতি প্রজ্বালন, গণসংগীত ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী।

write a comment

0 Comments

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

Add a Comment

Your data will be safe! Your e-mail address will not be published. Also other data will not be shared with third person.
All fields are required.