খুলনা জেলা স্কুল মাঠে ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলনের করে

খুলনা জেলা স্কুল মাঠে ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলনের করে
March 22 16:30 2017

বিংশ শতাব্দিতে বাঙালীর শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলার স্বাধীনতা। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালী জাতির অহংকার ও গর্বের বিষয়। দীর্ঘ নয় মাস পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এদেশের বীর বাঙালী যুদ্ধ করে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলো।

২৪ বছরের পাকিস্তানী দুঃশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছিলো। ১৯৪৭ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ করে বৃটিশরা এদেশ ছেড়ে চলে যায়। জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দু’টি প্রদেশে বিভক্ত ছিলো।
পূর্ব পাকিস্তানে বহু ধর্মের মানুষ বাস করলেও তাদের ভাষা ছিলো বাংলা। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানী শাসকরা রাষ্ট্র ভাষা উর্দু করার ঘোষণা দেওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীরা তা মেনে নিতে পারেনি। প্রতিবাদে ঝলসে ওঠে বাঙালী । সালাম, রফিক, বরকত, জববার, শফিকের রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্র ভাষা বাংলাকে ছিনিয়ে আনা হয়। ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলন -প্রথম জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারী করা হয়, ১৯৬২ সালের কুখ্যাত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক ছাত্র জনতার গণ অভ্যূত্থান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। প্রত্যাহার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ রাজবন্দিদের মুক্তি ১৯৭০ এর নির্বাচনে এদেশের জনগণের ৬ দফার পক্ষে ম্যাডেন্ট প্রদান। বঙ্গবন্দুর আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করার পর ক্ষমতা হস্তান্তর পাক সামরিক শাসকদের ছলচাতুরী -এদেশের মানুষকে বাধ্য করেছিলো পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনে যেতে।
দীর্ঘ ২৪ বছর এই আন্দোলন সংগ্রামে বাঙালী জাতিকে অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে অনেক জাতীয় নেতাদের । এসব নেতাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মাওলানা ভাসানীর নাম উল্লেখযোগ্য। জাতি বঙ্গবন্ধুকে ৭০-এর নির্বাচনে ম্যান্ডেট নিয়েছিলো দেশ পরিচালনার জন্য।

৭ই মার্চ ১৯৭১ এ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে ঘোষণা করেন ‘‘ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ’’ এবং যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার আহবান জানান।

সারাদেশে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা হয়। কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ইকবাল হলে বসে স্বাধীনতার পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, স্বাধীনতার ইস্তেহার প্রস্ত্তত করেন। সিদ্ধান্ত হয় যে, ২৩ মার্চ ১৯৭১ এ পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানী পতাকার পরিবর্তে সারা বাংলায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করতে হবে। জয়বাংলা বাহিনী নামে একটি মিলিট্যান্ট বাহিনী গঠন করা হয়।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে বিচারধীন অবস্থায় পাকিস্তানীরা গুলি করে হত্যা করার পর তারই স্মরণে ‘‘সার্জেন্ট জহুর বাহিনী’’গঠন করেছিলো ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। এই বাহিনী পরবর্তীতে জয়বাংলা বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়। খুলনাতে গড়ে তোলা হয় ১১ সদস্য বিশিষ্ট জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এর আহবায়ক করা হয় স. ম. বাবর আলী ও হুমায়ুন কবীর বালুকে। জয় বাংলা বাহিনীর প্রধান করা হয় আমাকে। স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ -এর তৎকালীন নেতৃত্বে নজরুল রহমান জাহিদ ও শেখ কামরুজ্জামান টুকুর পরামর্শে পরিচালিত হতো।

আমরা খুলনাতে জয়বাংলা বাহিনী গঠন করে খুলনা জেলা স্কুল মাঠে ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলনের কুচকাওয়াজের মহড়া দেই। দাউদ আলী, আ. ব. ম. নুরুল আলম, এনায়েত আলী, স.ম ইউসুফ আলী, মাহবুবুল আলম হিরণ, হেকমত, তৈয়েবুল বাহার, মোশারেফ হোসেন, কায়কোবাদ, হায়দার গাজী সালাউদ্দিন রুনু, শেখ শহিদুল ইসলাম, এস্কান্দার কবির বাচ্চু, আবুল কাশেম, মিজানুর, আজিজুল ইসলাম, ফ.ম. সিরাজ, নুরুল ইসলাম খোকন, সেকেন্দার আলী, আব্দুস সামাদ, স.ম. সাত্তার , আব্দুস সবুর, খায়রুল আলমসহ প্রায় ৫০ জন। প্রতিদিন বিকালে জেলা স্কুলের মাঠে মহড়ায় অংশ গ্রহণ ছাড়াও দেওয়াল লিখনের কাজে গভীর রাতে আমরা অনেকে অংশ নিতাম। স্টেটস ব্যাংকের গেটের দেওয়ালে লাল কালি দিয়ে আমরাই প্রথম বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর লিখি ।
১৯৬৯ এর ১১ দফা আন্দোলন, ৭০ এর নির্বাচন ও ৭১ এর অসহযোগ আন্দোলনে হাসিনা বানু শিরিন, ফেরদৌস বেগম, কৃষ্ণা দাশ প্রমুখ মহিলা নেতৃবৃন্দ বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এদিকে ঢাকা থেকে কোন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতা বদিউল আলম ও রবিউল আলম মধ্য মার্চে খুলনা আসেন পতাকার নমুনা নিয়ে। গাঢ় সবুজের মধ্যে লাল বৃত্ত। লাল বৃত্তের মধ্যে সোনালী রং এর পূর্ব বাংলার মানচিত্র। নজরুল ইসলাম, আমি, বালু বাজারে যাই, গাঢ় সবুজ লাল আর সোনালী রং এর কাপড় কিনে পতাকা তৈরী করার জন্য। সেদিন বাজারে কাপড় ব্যবসায়ীরা যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিলেন। কিছু টাকা মরহুম মমতাজ আলী (জেমস্ ফিনলের কর্মচারী ) ও মরহুম লু.র. জাহাঙ্গীর (সাংবাদিক) আমাদের দিয়েছিলেন। সেলাইয়ের মুজুরী ও কাপড়ের দাম বাকী রাখতে হয়েছিলো। প্রায় দুশতাধিক পতাকা তৈরী করে তা বিভিন্ন দোকান ও ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেছিলাম।
খুলনাতে আরও পতাকার প্রয়োজন তাই তৎকালীন খুলনা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দেশের ডাক পত্রিকার সম্পাদক লু. র. জাহাঙ্গীরকে অনুরোধ করি: ঐদিন বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করার এবং তার পত্রিকায় অর্ধ র্পৃষ্ঠা ব্যাপী স্বাধীনতার পতাকা (রঙিন) ছাপানোর। তিনি আমাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে খুলনা ব্লক আর্ট থেকে ব্লক তৈরী করে পত্রিকায় ছাপিয়ে সরবরাহ করেছিলেন হাজার হাজার কাগজের রঙিন পতাকা।

write a comment

0 Comments

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

Add a Comment

Your data will be safe! Your e-mail address will not be published. Also other data will not be shared with third person.
All fields are required.