‘বঙ্গবন্ধুর আগমন ঠেকানোর জন্য ছক কষছিলেন আনোয়ার হোসেন’

‘বঙ্গবন্ধুর আগমন ঠেকানোর জন্য ছক কষছিলেন আনোয়ার হোসেন’
June 20 00:46 2017

এর মধ্যে মহা ধুমধামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবর্ষের ছাত্রছাত্রীরা পালন করলেন র‌্যাগ ডে। জুন মাসের একটা দিন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর নাচে-গানে, হই-হল্লায়, উৎসবে রঙিন হয়ে উঠলো। রাষ্ট্রপতির ছেলে শেখ কামাল ছিলেন কেন্দ্রীয় র‌্যাগ ডে উদ্‌যাপন কমিটির আহ্বায়ক। তাঁর নিপুণ নির্দেশনায় কোনো খুঁত ছিল না। সবাই মিলে তাঁকে তকমা দিলেন ‘র‌্যাগ মার্শাল’। বিকালে কলাভবন চত্বরে বটতলায় মঞ্চ সাজিয়ে আন্তঃহল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতিযোগিতা হলো। চ্যাম্পিয়ন হলো মুহসীন হল। সন্ধ্যায় সবাই মিলে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সবুজ চত্বরে বসে প্রজেক্টরে ছবি দেখলেন। শেখ কামাল জোগাড় করেছিলেন হিন্দি ছবি সত্যকাম। অনেক রাত পর্যন্ত আনন্দে মেতে থাকলেন সবাই। মনেই হলো না, দেশে কোনো সমস্যা আছে।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ ‘রক্তাক্ত আগস্ট’ শীর্ষক এক লেখায় এসব কথা লিখেছেন। প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটি লেখকের আওয়ামী লীগের ইতিহাস নিয়ে লেখা বইয়ের তৃতীয় পর্বের একটি অধ্যায়ের অংশবিশেষ।
মহিউদ্দিন আহমদ আরো লিখেছেন, আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ শেষপর্বের পরীক্ষা শুরু হলো। ছাত্র-শিক্ষক সবাই ব্যস্ত। চ্যান্সেলর শেখ মুজিবুর রহমান ১৫ই আগস্ট সকালে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন। সর্বত্র ঘষামাজা চলছে। একটা প্রচার ছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে মহাসমারোহে বাকশালে যোগ দেবেন।
চ্যান্সেলর শেখ মুজিবের আগমন ঠেকানোর জন্য ছক কষছিলেন প্রাণরসায়ন বিভাগের লেকচারার আনোয়ার হোসেন। তিনি ছিলেন জাসদের সামরিক সংগঠন বিপ্লবী গণবাহিনীর ঢাকা নগরের কমান্ডার। শেখ মুজিবের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন উপলক্ষ করে গণবাহিনী কিছুটা ভীতি ছড়াতে চেয়েছিল। এ বিষয়টা বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে গণবাহিনীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার মোশতাক আহমেদের বয়ানে:
‘আনোয়ার ভাই শিক্ষকদের একটা লিস্ট আইনা আমারে দিছে। তারপর আমি বাংলাবাজার যাইয়া এনভেলাপ কিনলাম। উনার ভাই বাহার কোথা থেকে একটা সাইক্লোস্টাইল মেশিন আনলো। ওখানেই কপি করা হয়। আপিলটা বাকশালে জয়েন না করার জন্য। কারও সই ছিল না। প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের জন্য চিঠিগুলো আলাদা করছি। আমরা একই সময়ে সব ডিপার্টমেন্টে দিয়া আসছি। এটা ১৫ই আগস্টের দুই দিন আগে। ১৫ই আগস্ট টিচাররা সবাই বাকশালে জয়েন করবে এমন একটা কথা ছিল। এটা যেন না করে।
ফকিরাপুলের একটা ঢালাই কারখানায় বোমার খোল বানানো হতো। আনোয়ার ভাই আমারে একবার নিয়া গেছিল। একটা ছালার ব্যাগে ভইরা সেই খোল মোটরসাইকেলের পেছনে কইরা নিয়া গেল, মিরপুরে পাঠাইয়া দিলো। হয়তো আরো ডেলিভারি হইছে। নিয়া তো ‘নিখিল’ বানানো হইছে। (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার নিখিল চন্দ্র সাহা চুয়াত্তরের ২৬শে নভেম্বর জাসদের হরতাল উপলক্ষে বোমা বানাতে গিয়ে দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণে নিহত হয়েছিলেন। তাঁর স্মরণে গণবাহিনী তাদের তৈরি বোমার নাম রেখেছিল ‘নিখিল’।)
১৪ই আগস্ট তো ইউনিভার্সিটিতে হাই এক্সপ্লোসিভ ফাটানো হইল। এইটা বাকশালে জয়েন না করতে থ্রেট আর কি। সায়েন্স বিল্ডিং, এ্যানেক্স বিল্ডিং, কলাভবন, ভিসির অফিসের সামনে চারটা টাইম বোমা পাঠানো হইল। ভিসির অফিসের সামনে আর কলাভবনের দায়িত্বে ছিল বাহার।
আগের দিন আলাপ হইছে, আমি এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে ডেলিভারি নিব। সকালে যাইয়া আমার দুইটা ডেলিভারি নিলাম। সায়েন্স বিল্ডিং আর অ্যানেক্সের দায়িত্বে আমি ছিলাম। এসএম হলের আশরাফ ভাই আর আহসান ভাই, এই দুইজন গেছে অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ে বোমা ফাটাইতে। কার্জন হলের সামনেরটা করছে নূর মোহাম্মদ।
আনোয়ার ভাই সকালে আমারে বললো যে, তোমারে টাইম দিছি একটা-দেড়টা, ওই সময় দোয়েল চত্বরের দিকে দাঁড়াবা। হবে কি হবে না এটাই জানাবো। ওই হিসাবে আমি এদেরকে সকালে জিনিস দিয়া দিছি। আমি একদম টাইমলি ওই জায়গায় আসছি। এমন বৃষ্টি! তখন রক্ষীবাহিনীতে ভরা জায়গাটা। আনোয়ার ভাই বাংলা একাডেমির দিক থেকে আইসা রিকশাটা থামাইল। এই পাশে আইসা বললো। বইলাই রিকশায় ওইদিকে চইলা গেল। আমি ওখান থেকে জিমনেসিয়ামের দিকে গেলাম। আমি গ্যালারিতে বসা। দুইটা আওয়াজ শুনলাম। আমি এদেরকে মিলিত হওয়ার জায়গা দিলাম- মেডিকেল কলেজের ক্যান্টিন। দেখলাম আশরাফ ভাই। কোনো ক্ষয়ক্ষতি নাই। আমাকে রিপোর্ট করলো, কেউ ধরা পড়ে নাই। তারপর ওইখান থেকে যে যার মতো চইলা গেলাম। আমি রাত্রে মুহসীন হলে ছিলাম।
ঢাকা সেনানিবাসে লেখা হচ্ছিল নাটকের নতুন স্ক্রিপ্ট। পরিচালক সাঁজোয়া বাহিনী বেঙ্গল ল্যান্সার্সের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর দেওয়ান ইশরাতউল্লাহ সৈয়দ ফারুক রহমান এবং তাঁর প্রধান সহযোগী সেকেন্ড ফিল্ড আর্টিলারির অধিনায়ক মেজর খন্দকার আবদুর রশিদ। ফারুক চুয়াত্তর সালেই মন স্থির করেছিলেন ‘হি (মুজিব) মাস্ট গো’ (মুজিবকে সরতেই হবে)।
ফারুক-রশিদ একা ছিলেন না। সরকার ও রাজনীতি সম্পর্কে সামরিক বাহিনীর মধ্যে জন্ম দিয়েছিল নেতিবাচক মনস্তত্ত্ব। এই মনস্তত্ত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন পাওয়া যায় সেনাবাহিনী থেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবসরে যাওয়া লে. কর্নেল আবু তাহেরের মধ্যে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী:
পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভূমিকা সবারই জানা, কীভাবে একটার পর একটা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছিল, কীভাবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়েছিল। আমাদের লালিত সব আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও মূল্যবোধ একের পর এক ধ্বংস করা হয়েছিল। গণতন্ত্রকে অত্যন্ত নোংরাভাবে কবর দেয়া হয়েছিল। জনগণকে পায়ের নিচে পিষে জাতির ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্র…।
শেখ মুজিব জনগণের নেতা ছিলেন। অস্বীকার করার অর্থ হবে সত্যকে অস্বীকার করা। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তাঁর ভাগ্য নির্ধারণের ভার জনগণের ওপরই বর্তায়। জনগণের উচিত হবে জেগে উঠা এবং প্রতারণার দায়ে মুজিবকে উৎখাত করা।
অদৃষ্টবাদী ফারুক ২রা এপ্রিল (১৯৭৫) চট্টগ্রামের হালিশহরের বিহারি কলোনিতে আবদুল হাফিজের সঙ্গে দেখা করে তাঁর আশীর্বাদ চান। জন্মান্ধ এই ফকির ‘আন্ধা হাফিজ’ নামে পরিচিত। তিনি ফারুককে তিন মাস অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। এই সব কথা উঠে এসেছে পরবর্তী সময়ে ফারুক ও রশিদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন লন্ডনে সানডে টাইমস-এর প্রতিবেদক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস।
১৪ই আগস্ট ১৯৭৫। দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠানে যাবেন। দিনটা কেমন কেটেছিল? তাঁর আশেপাশে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের একজন হলেন সহকারী প্রেস সচিব মাহবুব তালুকদার। তিনি ঘটনাক্রমে বর্ণনা করেছেন এভাবে :
দুপুরে তিনি ডেকেছিলেন আবদুল তোয়াব খান (রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব) ও আমাকে। বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতা তৈরি করতে। আমি একটু বিস্মিত হয়েছিলাম, তিনি কি তাহলে লিখিত ভাষণ দেবেন? তোয়াব খান কথাটা জিজ্ঞাসা করলেন তাঁকে। তিনি বললেন, লেখা বক্তৃতা নয়, মুখেই বলবো। তবে হাতের কাছে লিখিত সমস্ত ডাটা ও ইনফরমেশন থাকতে হইব।
বিকালবেলা শিক্ষা সচিব এম মোকাম্মেল হক আসবেন গণভবনে। তাঁর কাছ থেকে সব তথ্য সংগ্রহ করে একটা খসড়া তৈরি করার নির্দেশ দিলেন প্রেস সচিব। আমি নির্ধারিত সময়ে শিক্ষা সচিবের জন্য অপেক্ষা করছি। তিনি যথাসময়ে আসছেন না দেখে আমার উদ্বেগ বাড়লো। তথ্যাদি না পেলে বক্তৃতাই বা তৈরি করব কেমন করে?
ইতিমধ্যে এলো দুঃসংবাদ। রামগতিতে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার ভেঙে পড়েছে। নিহত হয়েছেন কয়েকজন ভারতীয় সৈনিক। বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে আমাদের কিছুটা মতদ্বৈধতা দেখা দিয়েছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জে এন দীক্ষিত বলছেন, সংবাদটা পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়া ঠিক হবে না। আবদুল তোয়াব খান বললেন, আলাপ-আলোচনার পরে এ বিষয়টির সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এ নিয়ে প্রেস সচিব অত্যন্ত পেরেশানিতে পড়ে গেলেন।
সন্ধ্যার পরপরই বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বরের বাসভবনে চলে গেছেন। তাঁকে বলেছিলাম, আজ সন্ধ্যায় ফরাসউদ্দীনের ফেয়ারওয়েল ডিনার।
হ, জানি। বঙ্গবন্ধু বললেন, তার মানে আমারে এখনই ছুটি দিলা তোমরা। মৃদু হেসে বললেন, ফরাসের ডিনারে তো আমি থাকতে পারি না।
বঙ্গবন্ধু বাসায় চলে যাওয়ার পরপর শিক্ষা সচিবের ফোন এলো। জানালেন, কিছুটা অসুস্থ বোধ করছেন। এ অবস্থায় তিনি গণভবনে আসতে অপারগ। তথ্যগুলো টেলিফোনে লিখে নিতে অনুরোধ করলেন। তিনি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এবং এই নির্দেশ শিরোধার্য। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে তিনি আমাকে ডিকটেশন দিতে থাকলেন। আমি যাবতীয় তথ্য লিখে নিলাম। আমার উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হলো।
আবদুল তোয়াব খান রামগতির ঘটনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। পরে তাঁর মনে হলো, এই সিদ্ধান্তটা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে আসা প্রয়োজন। তিনি ফোন করলেন বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু বললেন, তুমি আমার অফিস গিয়া রেড টেলিফোনে আমারে ফোন করো।
তোয়াব খান বঙ্গবন্ধুর অফিস কক্ষে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন তিনি। কি কথা হয়েছে আমি জানি না। এর মধ্যে আবার ভারতীয় দূতাবাস থেকে ফোন এলো।
তোয়াব খান জানালেন, দুর্ঘটনার খবর পত্রিকায় জানাতে হবে। নইলে দেশবাসীর মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে।
ভারতীয় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জানালেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে দিল্লির সঙ্গে কথা বলেছেন।
প্রেস সচিব বললেন, আমরা উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এমতাবস্থায় আমাদের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
প্রেস সচিব যখন বঙ্গবন্ধুর কক্ষে কথা বলতে গেছেন, ঠিক তখনই তাঁর ঘরের টেলিফোন বাজলো। রাত ৯টা হবে। ফোন ধরে বুঝতে পারলাম তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দীন ঠাকুর। তিনি বললেন, এত রাতে কি করছো ওখানে?
বললাম, অফিসের কাজ করছি। আগামীকাল বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, তাঁর বক্তৃতা তৈরি করছি।
তোয়াব সাহেব কোথায়?
তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে গেছেন তাঁর অফিস ঘরে।
ওখানে কেন?
রেড টেলিফোনে কথা বলছেন। বললাম, তুমি একটু লাইনে থাকো। আমি তোয়াব ভাইকে ডাকছি।
না, দরকার নেই। তাহেরউদ্দীন ঠাকুর ফোন ছেড়ে দিলেন।
প্রেস সচিব ঘরে ফিরলে আমি তাকে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর ফোনের কথা বললাম। তিনি বললেন, প্রয়োজন হলে তিনি আবার ফোন করবেন।
আমি নিজের অফিসে এলাম। ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে ৯টা। লেখায় আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লাম আমি। এরই মধ্যে ডিএফআই-এর নবনিযুক্ত চিফ কর্নেল জামিল আমার ঘরে এলেন। বললেন, আপনারা পেয়েছেন কি? সবাই খাবার সামনে নিয়ে আপনাদের অপেক্ষায় বসে আছেন। ওদিকে তোয়াব সাহেব কি নিয়ে ব্যস্ত, এদিকে আপনিও লেখায় ব্যস্ত।
বললাম, জামিল ভাই, আপনি যান। আমি এখনই আসছি।
কর্নেল জামিল চলে গেলেন। সত্যি অনেক দেরি হয়ে গেছে। রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব ফরাসউদ্দীনের বিদেশ যাত্রা উপলক্ষে বিদায়ী নৈশভোজ। তাড়াতাড়ি কাগজপত্র ঠেলে রেখে উঠে পড়লাম। নৈশভোজে গিয়ে আমি বসলাম কর্নেল জামিলের পাশে। খেতে খেতে তাঁর সঙ্গে গল্প করলাম।
রাত ১১টার পর অফিস ছেড়েছি।… বাসায় এসেও কাজের কমতি নেই আমার। … আবার বসলাম বক্তৃতার খসড়া নিয়ে।… রাত প্রায় দেড়টায় আমার কাজ শেষ হলো।
মাহবুব তালুকদারের বর্ণনায় জানা যায়, ১৪ই আগস্ট গণভবনে সবাই মিলে অনেক রাত পর্যন্ত খানাপিনা ও গল্পে মশগুল ছিলেন। বঙ্গবন্ধু সেখানে ছিলেন না। রাত ৯টায় ফোন করে তাহেরউদ্দীন ঠাকুর নিশ্চিত হয়েছিলেন যে রাষ্ট্রপতি তাঁর বাসায় আছেন। গণভবনে বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন কর্মকর্তারা যখন নির্ভার সময় কাটাচ্ছেন, তার কয়েক কিলোমিটার দূরে কুর্মিটোলায় সেনাবাহিনীর এক মেজর তার সৈন্যদের নিয়ে একটা অভিযানের ছক সাজাচ্ছেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরের পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে যারা গণবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাঁরা ছিলেন সবাই ‘ফুট সোলজার’। তাঁদের যেভাবে নির্দেশ দেয়া হতো, তাঁরা তা তামিল করতেন। ১৫ই আগস্ট সকালে হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে তাঁরা হকচকিত হয়ে পড়েন। গণবাহিনীর মোশতাক আহমেদের বর্ণনা থেকে জানা যায়:
মুহসীন হলে গণবাহিনীর আমি, নূর মোহাম্মদ, ফখরুল, বাছেত, তাজুল ভাই এই রকম ছয়জন ছিলাম। আমরা রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সামনে দিয়া, দশটা-এগারোটার দিকে হবে, হাঁটতেছি। আমরা তো ফার্স্ট ইয়ারের। কী হইছে বুঝতেছি না। আমাদের সাথে কেউ যোগাযোগ করতেছে না। এইটুকু আমরা বুঝছি যে, খারাপ কিছু। হলে আইসা এক রুমে আমরা শুইয়া রইছি। কখন কী অর্ডার আসে। তখন এমন ছিল, বলার সাথে সাথে নাইমা যাইতাম।
আবু আলম ভাই আমাদের সাথে শুরুতে ছিলেন, ইউনিভার্সিটির কমান্ডে। আবু আলম সাসপেন্ড, অব্যাহতি আর কি। ১৫ই আগস্টের সময় আমি কমান্ডার। আমি ফার্স্ট ইয়ারের ছেলে। অন্যরা সিনিয়র। আনোয়ার ভাই এমনভাবে দায়িত্ব দিছে, সিনিয়র-জুনিয়র না বুইঝাই। পরে আনোয়ার ভাই দুইটা-আড়াইটার দিকে যোগাযোগ করছে। বাচ্চুরে দিয়া ইনফরমেশন পাঠাইছে একটা চিঠি দিয়া। (মীর নজরুল ইসলাম বাচ্চু ২৬শে নভেম্বর ১৯৭৫ ভারতীয় হাইকমিশনে একটা অভিযান চালানোর সময় নিহত হন)। অবাস্তব চিঠি। লিখছে যে, ‘অবস্থা ভালো। সব রকম চেষ্টা চলছে। স্বর্ণ এবং অস্ত্র জোগাড়ের চেষ্টা কর।’ মানে এগুলা কোথাও থিকা পাইলে নিয়া নাও। সেন্সটা এই। এলিফ্যান্ট রোডে যোগাযোগ করতে বললো।
এলিফ্যান্ট রোডে গেলাম। যাইয়া দেখি যে, ইউসুফ ভাইয়ের (কর্নেল তাহেরের বড় ভাই বিমান বাহিনীর সাবেক সার্জেন্ট আবু ইউসুফ) বাসায় এক জিপ আর্মি। এখানে আর্মি ঢুকে কেন? আমি ব্যাক কইরা মেইন রোডের দিকে চইলা আসতেছি। বাহার বাসা থিকা দৌড়ায়া আইসা আমারে জড়াইয়া ধরলো। আর্মিদের সামনেই নিয়া গেল। ভিতরে বসলাম। দেখলাম আনোয়ার ভাই আসলো। আর্মিও কয়েকজন বসা। আমি তো বুইঝা উঠতে পারতেছি না, আর্মি এখানে কেন? তখন আনোয়ার ভাই বললো যে, সব জায়গায় যাইয়া খবর দাও। আমি বললাম, সব জায়গায় মুভ করতে করতে তো সন্ধ্যা হইয়া যাইবো? পাঁচটা থেকে তো কারফিউ? কী করি? মিলিটারিরা বললো, স্যার একটা চিঠি লেইখা দিবে। স্যার মানে কর্নেল তাহের। তাহের ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয় নাই। আনোয়ার ভাই বললো যে, ধরা পড়লে বলবা কর্নেল তাহেরের লোক। উনি মিলিটারিদের সামনেই আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।

write a comment

0 Comments

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

Add a Comment

Your data will be safe! Your e-mail address will not be published. Also other data will not be shared with third person.
All fields are required.