মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা | Magura District | মাগুরা জেলা

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা | Magura District | মাগুরা জেলা
March 06 20:51 2017 Print This Article

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা

BBC71 NEWS –বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্র আজ সগৌরবে স্থান করে নিয়েছে। এ স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের লক্ষ্যে এদেশের মুক্তি পাগল মানুষ বিগত ১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধে অবর্তীন হয়েছিল। ঝাপিয়ে পড়েছিল পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মহান লক্ষ্যে। লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত, সে স্মৃতি বড় গর্বের ও বেদনার। ৭১ এর সে মুক্তিযুদ্ধে মাগুরা অঞ্চলেরও উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। সে অহংকারের স্মৃতি নতুন প্রজম্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব জেলা ও মহকুমায় সর্বস্তরের ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত হয় সংগ্রাম কমিটি। মাগুরাবাসীও একাজে পিছিয়ে ছিলনা। তৎকালীন পাকিস্থানের জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের (যথাক্রমে এম,এন,এ এবং এম,সি,এ) নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতায় মাগুরায় গঠিত হয় সংগ্রাম কমিটি। একইভাবে স্থানীয় সকল ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত হয় ষ্টুডেন্ট এ্যাকশান কমিটি (স্যাক)।

মাগুরায় সংগ্রাম কমিটির প্রধান ছিলেন মরহুম সৈয়দ আতর আলী। এই কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন এ্যাডভোকেট আছাদুজ্জামান এম,সি,এ পরে এম,পি, সদর উপজেলার অলোকদিয়া গ্রামে মরহুম সৈয়দ তয়বুর রহমান (চেয়াম্যান বগীয়া ইউপি), শিবরামপুর গ্রামের আলহাজ্ব খোন্দকার আঃ মাজেদ (সাবেক চেয়াম্যান, পৌরসভা), শ্রীপুরের টুপিপাড়া গ্রামের চেয়াম্যান আলহাজ্ব আকবার হোসেন মিয়া (পরে শ্রীপুর বাহিনীর অধিনায়ক), মাগুরা শহরের আলতাফ হোসেন, এস, এ সিদ্দিকী বেবী, সৈয়দ মাহবুবুল হক বেনু মিয়া, বেলনগর গ্রামের এ,এফ,এম এ ফাত্তাহ, এ্যাডভোকেট মরহুম আবুল খায়ের, পারনান্দুয়ালী গ্রামের মরহুম আফসারউদ্দিন মৃধা প্রমুখ। এ সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা হিসাবে ছিলেন তৎকালীন এম,এন,এ, মাগুরা শহরের এ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন। মাগুরার তৎকালীন এসডিও ওয়ালিউল ইসলাম (অবঃ সচিব) শুরু থেকেই সংগ্রাম কমিটিকে সঙ্গোপনে সমর্থন ও সহযোগিতা করতে থাকেন।

মাগুরা সদর ছাড়াও শ্রীপুর থানা এলাকায় আকবর হোসেন মিয়া, মোল্যা নবুয়ত আলী, কাজী ফয়জুর রহমানের মহম্মদপুর এলাকায় মরহুম আঃ রশীদ বিশ্বাস এম,পি, মরহুম নজরুল ইসলাম নজির মিয়া, মির্জা আতিয়ার রহমান, গোলাম রববানী প্রমুখ। শালিখা থানার প্রয়াত মুধুসুদন কুন্ডু, ডাঃ তারাপদ বিশ্বাস প্রমুখ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্ত্ততিমূলক তৎপরতায় নেতৃত্ব দেন।

১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল শুক্রবার দুপুরের দিকে ঝিনাইদহ থেকে আলমখালী হয়ে এবং যশোর থেকে সীমাখালীর পথ ধরে পাক সেনারা একযোগে মাগুরার দিকে আসতে থাকে। ঝিনাইদহ থেকে আগত পাকসেনাদলের বিশাল গাড়ীর বহর মাগুরার আলমখালী বাজার সংলগ্ন রাস্তায় থামিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করতে থাকে। এসময় আলমখালী ব্রীজ ও রাস্তার লগোয়া উত্তরের বাড়ীর বাসিন্দা কুলু সম্প্রদায়ের শ্রী সুরেন কুলু ভয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পাক সেনারা তার আঙ্গিনায় সুরেন কুলুকে গুলি করে হত্যা করে। সাঁজোয়া গাড়ীর বহর শহরে না ঢুকে ভায়না মোড় অতিক্রম করে সোজা চলে যায় মাগুরা কামারখালী সড়কের দিকে এবং পারনান্দুয়ালী গ্রামের মধ্যে বর্তমান বাস টার্মিনাল সংলগ্ন পাকা রাস্তার উপর প্রায় আধা মাইল দীর্ঘ সারি দিয়ে সেনাবাহিনীর গাড়ী দাঁড়িয়ে থাকে। কোন প্রতিরোধ আসে কি না তা আঁচ করার জন্য।

এ সময় বাগবাড়ীয়া গ্রামের ঝাকড়া চুলের সুঠামদেহী লালু পাগলা পাগলামীর বশে হুংকার দিয়ে পাকসেনাদের গাড়ীর কাছে এগিয়ে গেলে পারনান্দুয়ালী স্কুলের সামনের রাস্তায় পাকসেনার গুলিতে লুটিয়ে পড়ে লালু পাগলের নিথর দেহ। পাক সেনাদল সন্ধা পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষার পর ও কোন হামলা বা প্রতিরোধের সম্মুখীন না হওয়ায় নিরাপদ বোধ করে। এদেরই একটি অংশ সন্ধ্যার দিকে মাগুরা শহরের পি,টি,আই, তে ক্যাম্প স্থাপন করে। পরদিন মাগুরা শহরের ভি,টি,আই, সরকারী বালক বিদ্যালয় ও বর্তমান উপজেলা পরিষদ ভবন সহ অন্যান্য স্থানে পাক ক্যাম্প স্থাপন করে। এদিন ২৪ এপ্রিল বাংলা ১০ই বৈশাখ শনিবার বিকেলে পাকসেনাদলের ৫/৬ খানা খোলা জীপ মাগুরা শহরের নতুন বাজার এলাকায় যেয়ে কয়েকটি পাটের গুদামে অগ্নিসংযোগ করে এবং আশে-পাশের লোকজনদেরকে গুদামের মালামাল লুটপাট করতে নির্দেশ দেয়।

এর পরপরই সন্ধ্যার প্রাক্কালে ঐ সেনাদলটি মাগুরা থানা ও ডাকঘরের অদুরে টাউন হল ক্লাবের সামনে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জগবন্ধু দত্তের বাড়ির সামনে এসে থামে। বিশাল বাড়ীতে তখন জগবন্ধু দত্ত একা ছিলেন। সেনা সদস্যরা বাড়ির আঙ্গিনায় গুলি করে বৃদ্ধ জগবন্ধু দত্তকে হত্যা করে থলে ভর্তি স্বর্নালংকার টাকা-পয়সা নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় অস্ত্রের মুখে পথচারীদের ঐ বাড়ির মালপত্র লুট করতে প্ররোচিত করে। এভাবেই পাক সেনারা মাগুরায় হত্যা লুট ও ধ্বংস যজ্ঞে উৎসাহের সূচনা করে।

পাক সেনাদের নির্দেশে ও সরাসরি তত্ত্ববধানে মাগুরায় গঠিত হয় শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর বাহিনী। মানুষের ব্যাপক আস্থা অর্জনে সক্ষম ইতিমধ্যে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ এর উপর নির্ভর করে মাগুরার বিভিন্নস্থানে মুক্তি সেনাদল গঠিত হতে থাকে। অপরদিকে ভারত থেকে সশস্ত্র অবস্থায়ও অনেকে মাগুরা অঞ্চলে ফেরত আসতে থাকে এভাবে গ্রামঞ্চলে বেশ কয়েকটি মুক্তি বাহিনীর প্রকাশ ঘটে। এর মধ্যে শ্রীপুর বাহিনী, ইয়াকুব বাহিনী, মাজেদ খোন্দকারের বাহিনী, মুজিব বাহিনী ছাড়াও আরো অন্যান্য ছোট ও বড় গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধারা কখনও একক দলে কখনও অন্যান্য দলের সাথে যৌথভাবে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমন অব্যাহত রাখে। এর ফলে হানাদার বাহিনীর ঢালাও ভাবে গ্রাম-গঞ্জে জ্বালানো-পোড়ানো ও হত্যাযজ্ঞের অপঃতৎপরতা অনেকাংশে ব্যাহত হতে থাকে।

খারাপ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, বন্যার পানি, নদী, খাল, বিল, বনাঞ্চল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মে হতে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে হানাদার বাহিনীর কার্যক্রম স্থিমিত হয়ে পড়ে। আর এ সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা কার্যকলাপ সবচেয়ে ফলপ্রসূ হয়। নহাটা-জয়রামপুরের মোড়, শ্রীমন্তপুর, শ্রীপুর ও মহম্মদপুর সদরসহ অনেক সম্মুখ যুদ্ধে মাগুরার মুক্তিযোদ্ধাদের বীরোচিত ইতিহাস স্বাধীনতার অধ্যায়কে সমৃদ্ধ করেছে। মাগুরায় বিভিন্ন ক্যাম্পে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-শস্ত্র গোলা বারুদ এবং প্রবল শক্তি বৃদ্ধি করেছিল হানাদার বাহিনী।

এত বড় দূর্ভেদ্য দূর্গে চুড়ান্ত আঘাত হানতে বিমান হামলা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ঈগল কোম্পানীর প্রধান এটিএমএ ওহাবের পরামর্শে আকবর হোসেন মিয়া নিজ দলীয় রেকি বাঁশি জোয়ারদারকে গোপনে মাগুরা শহরে পাঠিয়ে হানাদার বাহিনীর অবস্থানের মানচিত্র তৈরী করেন যা পাঠিয়ে দেয়া হয় সেক্টর হেড কোয়ার্টারে। ৬ই ডিসেম্বর বেলা ১১ টার দিকে শ্রীপুর বাহিনী চলে আসে মাগুরার পার্শ্ববর্তী নিজনান্দুয়ালী গ্রামে। অপর দিকে মিত্র বাহিনীর বিমান হামলা শুরু হয়ে যায় মাগুরা শহরের শত্রুদের বিভিন্ন ক্যাম্পে।

একদিকে বিমান হামলা অপর দিকে মুক্তিযোদ্ধারা শহরের উত্তর পশ্চিমে নতুন বাজার এলাকায় ঢুকে পড়ে। এ অবস্থায় পাকসেনারা সব ফেলে এবং কোন কোন ক্যাম্পে আগুন ধরিয়ে দিয়ে কামারখালীর দিকে পালাতে থাকে। এরা পারনান্দুয়ালী, বেলনগর, কছুন্দি, লক্ষীকান্দর, রামনগর, মাঝাইল গ্রামে অবস্থান নিয়ে কভারিং দিয়ে অন্যদের মধুমতি নদী পার হয়ে যেতে সহায়তা করে। এ সময় (৬ই ডিসেম্বর) পারনান্দুয়ালী গ্রামে অবস্থানকারী একদল পাকসেনা এ গ্রামের বাটুল মিয়ার (ওয়াপদায় চাকুরীরত) মাধ্যমে আকবর হোসেনের কাছে আত্মসমর্পনের প্রস্তাব পাঠান।

প্রস্তাব রাজি হয়ে আকবর হোসেন মিয়া এ সেনাদলের মেজরের কাছে চিঠি পাঠান। কিন্তু বাটুল মিয়াকে তারা প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়ে ফিরিয়ে দেয়। এমনকি পরক্ষণেই মাগুরা শহরের উপর পাক সেনারা পারনান্দুয়ালী ও লক্ষীকান্দর থেকে কয়েকটি মর্টার নিক্ষেপ করে। ৬ই ডিসেম্বর সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে অবশিষ্ট পাকসেনারা শহর ত্যাগ করে পূর্ববর্তী সঙ্গীদের অনুসরণ করে। ৭ই ডিসেম্বর সকালে শ্রীপুর বাহিনী গগনবিদারী স্লোগানে প্রকম্পিত করে মাগুরা শহরে প্রবেশ করে এবং পাক সেনাদের ক্যাম্প দখলে নিয়ে পারনান্দুয়ালী গ্রামের পাথে মাগুরা কামারখালী সড়কের স্লুইজ গেটে সশস্ত্র প্রতিরোধ ব্যুহ তৈরী করে অবস্থান নেয়।

এ দিকে বেলা ১১ টায় আকবর হোসেন মিয়া ও মোল্লা নবুয়ত আলী মাগুরা এসডিও অফিস ভবনে (বর্তমান এস, পি, অফিস) শহরের সরকারী বেসরকারী গণ্যমান্যদের নিয়ে সভা করেন। সভায় অফিস, ব্যাংক ইত্যাদি স্ব স্ব দায়িত্ব পালন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সবাইকে আহবান জানানো হয়। মাগুরার তৎকালীন এস,ডি,ও, মতিউর রসুল উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন। এদিন ৭ই ডিসেম্বর চারদিক থেকে আনন্দে আত্মহারা সাধারণ মানুষ ও দলে দলে মুক্তিযোদ্ধারা মাগুরা শহরে আসতে শুরু করে। বিকাল ৫টার দিকে ট্যাংক বহরসহ মিত্রবাহনী মাগুরায় এসে পৌছে।

বাহিনীর মেজর চক্রবর্তী মাগুরা পৌছে ঈগল কোম্পানীর ক্যাপ্টেন ওহাব ও আকবর হোসেন মিয়ার সাথে কামারখালীতে পাক সেনাদলের উপর হামলার পরিকল্পনা স্থির করেন। এভাবেই শত্রুমুক্ত মাগুরার প্রথম দিনটি অতিবাহিত হয় মিত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী ও বিজয়ের আনন্দে উল্লাসিত মাগুরাবাসীদের। পরবর্তীতে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকায় পাক সেনাদের আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

view more articles

About Article Author

write a comment

0 Comments

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

Add a Comment

Your data will be safe! Your e-mail address will not be published. Also other data will not be shared with third person.
All fields are required.