১৯ মার্চ : স্বাধীনতা অর্জনের মাস

১৯ মার্চ : স্বাধীনতা অর্জনের মাস
March 19 05:16 2017
 
বিবিসি একাত্তর নিউজ-
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে লেখা একটি ঐতিহাসিক দিন ১৯ মার্চ, ১৯৭১, পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর গোটা দেশের বাঙালি মুসলিমরা যখন স্বাধিকার আন্দোলনে উত্তাল ঠিক তখনই জয়দেবপুরের সর্বস্তরের কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতা পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। সে সময় দেশব্যাপী স্বাধীনতাকামী জনতার মুখে মুখে শ্লোগান ছিল “জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।”
রাজধানীর ৩০ কিলোমিটার উত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত জয়দেবপুর বর্তমানে গাজীপুর জেলা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে একাত্তরের পয়লা মার্চ থেকে সমগ্র বাংলাদেশে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। শ্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা দেশ। এর ঢেউ এসে লাগে জয়দেবপুর ও আশপাশের এলাকায়। আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করার লক্ষে তৎকালীন একজন সরকারি কর্মকর্তা আহমদ ফজলুর রহমানের বাসায় জয়দেবপুর এলাকার আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের ডাকে অনুষ্ঠিত এক সভায় গঠিত হয় সর্বদলীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ।এ পরিষদ গঠনের পর আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় সমরাস্ত্র কারখানা, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী ও ডিজেল প্ল্যান্টের শ্রমিক-কর্মচারীরাও এ আন্দোলনে যোগ দেন।
৫ মার্চ রথখোলার বটতলায় এক জনসভায় পাকিস্তানের জাতীয় পতাকায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য জয়দেবপুর থেকে বিপুল সংখ্যক নেতা কর্মী তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত জনসভায় যোগ দেন। সে সময় জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবাড়িতে অবস্থান ছিল ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের। এ রেজিমেন্টে ২৫/৩০ জন পশ্চিম পাকিস্তানী ছাড়া সবাই ছিলেন মনে প্রাণে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক।
মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলোতে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী নানা ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এরই অংশ হিসেবে কৌশলে বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করে বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়। বিষয়টি ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু বাঙালি অফিসার-সৈনিক আঁচ করেছিলেন। তারা এ আশংকার কথা গোপনে স্থানীয় কয়েকজন নেতাকেও অবহিত করেন।
শিগগিরই এ আশংকা সত্যে পরিণত হতে শুরু করে। ঢাকার ব্রিগেড সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ আসে, সব সৈনিককে ১৫ মার্চের মধ্যে ৩০৩ ক্যালিবার রাইফেল ব্রিগেডে জমা দিতে হবে। কিন্তু বাঙালি অফিসার ও সৈনিকরা অস্ত্র জমা দিতে অনিচ্ছুক। তাই ব্রিগেড কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় যে, এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে অস্ত্র নিয়ে ঢাকা যাওয়া বিপজ্জনক হবে। কিন্তু ব্রিগেড কর্তৃপক্ষ এতে মোটেও সন্তুষ্ট হলো না। তাই বার্তা এলো ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার পাঞ্জাবী ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আবরার নিজেই সঙ্গীয় রেজিমেন্টসহ জয়দেবপুর রাজবাড়ি পরিদর্শনে আসবেন। এটা যে আসলে বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে আসা তা বুঝতে বাকী রইলো না কারো।তাই রেজিমেন্টে সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি বিষয়টি স্থানীয় নেতাদের অবহিত করা হলো।যাই হোক ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আবরারকে ঠেকানোর জন্য জয়দেবপুরের রাস্তায় বেশ কিছু ব্যারিকেড দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়। পরে রাস্তার দেয়া বেরিকেড সরিয়ে ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি কোম্পানী কয়েকজন অফিসার ও সৈন্যসহ ১৯ মার্চ দুপুরে জয়দেবপুর রাজবাড়ির সেনানিবাসে উপস্থিত হলেন।
কিন্তু রেজিমেন্টের সর্তকতাবস্থা দেখে তারা অস্ত্র নেবার পরিকল্পনা বাতিল করলেন। এদিকে পাজ্ঞাবী সৈন্যরা বাঙালিদের নিরস্ত্র করতে এসেছে এ খবরটি দাবানলের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষ জয়দেবপুর বাজার ও আশ-পাশের এলাকায় জড়ো হতে থাকে। সমরাস্ত্র কারখানা, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী ও ডিজেল প্ল্যান্ট থেকেও শ্রমিক কর্মচারীরা এসে আশপাশে অবস্থান নেন। এদের অনেকের হাতেই ছিল লাঠিসোঠা, তীর, ধনুক আর বল্লম। উত্তেজিত জনতা রাস্তায় গাছ-পালা ইট দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। এমন কি মালগাড়ির একটি ওয়াগন এনে জয়দেবপুর রেল ক্রসিং এ ব্যারিকেড দেয়া হয়।
এদিকে সেনানিবাসে বসেই জাহানজেব আবরার খান রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়ার খবর পান। ক্রুব্ধ জাহানজেব ব্যারিকেড অপসারণের জন্য লে. কর্নেল মাসুদকে নির্দেশ দেন। লে. কর্নেল মাসুদ তখন মেজর মইনুলকে পাঠান স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে বুঝিয়ে ব্যারিকেড অপসারণ করতে। মেজর মইনুল নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান যে, এত লোককে বুঝানো সম্ভব নয়। একথা শুনে ক্রুব্ধ জাহানজেব সামনে বাঙালি সৈন্য পিছনে পাঞ্জাবী সৈন্য নিয়ে ঢাকার পথে রওয়ানা হন। কিন্তু উত্তেজিত জনতা ততক্ষণে জয়দেবপুরর রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে ফেলেছে।ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব গুলিবর্ষণ করে ব্যারিকেড অপসারণের নির্দেশ দেন। কিন্তু জনতার প্রতি সহানুভুতি দেখিয়ে বাঙালি সৈন্যরা ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে। উত্তেজিত জনতাও প্রবল ইট পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে।
ঠিক সেই সময় টাঙ্গাইলে রেশন পৌঁছে দিয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ট্রাক জয়দেবপুর ফিরছিল। এতে হাবিলদার সিদ্দিকুর রহমানসহ পাঁচজন বাঙালি সৈন্য ছিলেন এবং তাদের হাতে ছিল এস এমজি এবং চাইনিজ রাইফেল। জয়দেবপুর মসজিদের কাছে পৌঁছালে জনতা তাদের থামিয়ে পরিস্থিতি ব্যাখা করেন এবং তাদের অস্ত্র দিয়ে পাল্টা গুলিবর্ষণ করতে অনুরোধ জানালে তারা জনতার মনোভাব টের পেয়ে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। শুরু হয় গুলি-পাল্টাগুলি। জনতার মধ্যে থেকে গুলি বর্ষণের ঘটন্ায় পাঞ্জাবীরা অনেকটা হকচকিয়ে যায়।
পরে পাঞ্জাবী সৈন্যরা বহু কষ্টে সেদিন ব্যারিকেড অপসারণ করে জয়দেবপুর বাজারে পৌঁছে এবং কার্ফু জারির ঘোষণা দেয়। পাঞ্জাবী সৈন্যদের গুলিতে সেদিন জয়দেবপুর বাজারে প্রথম শহীদ হন নিয়ামত ও মনু খলিফ্।া এছাড়া গুলিতে আহত হন ইউসুফ ও শাহজাহান। এরপর প্াঞ্জাবী সৈন্যরা রাস্তার আরো ব্যারিকড অপসারণ করে ঢাকার পথে চান্দনা চৌরস্তায় উপস্থিত হন। এখানেও বীর জনতা গড়ে তুলে প্রবল প্রতিরোধ। হুরমত আলী নামে একজন অসম সাহসী যুবক এক পাঞ্জাবী সৈন্যকে ঝাপটে ধরে রাইফেল কেড়ে নেন। কিন্তু অপর এক পাঞ্জাবী সৈন্য তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে এতে তিনি শহীদ হন। এছাড়া কানু মিয়া নামে আরেক ব্যক্তি এখানে গুলিবিদ্ধ হন পরে আহত অবস্থায় মারা যান।
জয়দেবপুরের এই প্রতিরোধ যুদ্ধের কথা সেদিন দ্রুত সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিবিসিসহ বিভিন্ন বিদেশী প্রচার মাধ্যমে তা ফলাও করে প্রচার করা হয়। এমনকি পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনাকালে বঙ্গবন্ধু এ বিষয়টি তুলে ধরেন এবং তিনি একটি বিবৃতি দেন। প্রতি বছর স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসুচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করে থাকে।
  Article "tagged" as:
  Categories:
write a comment

0 Comments

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

Add a Comment

Your data will be safe! Your e-mail address will not be published. Also other data will not be shared with third person.
All fields are required.